ঈসা খাঁ,বাংলার প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন যিনি দেখেছিলেন

0
4

ঈসা খাঁ,বাংলার প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন যিনি দেখে ছিলেন।
ঈশা খাঁ একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন।মা বাবা তার সুশিক্ষার জন্য গৃহ শিক্ষকের ব্যবস্থা করেন।
(ঈসা খাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে ইতিহাসে একটু মতবিরোধ আছে, কেউ বলছে জন্ম ১৫২৯ কেউ বলছে ১৫৩৭)
ঈশা খাঁ সম্পর্কে ইতিহাসে সূত্রে জানা যায়,১৫২৯ সালে ১৮ আগষ্ট জন্ম গ্রহণ করেন। ১৫৩৭ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সরাইল পরগণায় ঈসা খাঁর জন্ম।তাঁর পিতা কালিদাস গজদানী ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে গৌড়ে এসে স্বীয় প্রতিভা গুণে রাজস্বমন্ত্রী পদে উন্নীত হন।পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম হয় সুলাইমান খাঁ।তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-৩৮) মেয়েকে বিয়ে করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জায়গীরদারী লাভ করেন।

১৫৪৫ সালে শের শাহের পুত্র ইসলাম শাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করার পর সুলাইমান খাঁ দিল্লীর আনুগত্য অস্বীকার করলে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর দুই নাবালক পুত্র ঈসা খাঁ এবং ইসমাইল খাঁকে একদল তুরানী বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ১৫৬৩ সালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে বহু অনুসন্ধানের পর সুদূর তুরান দেশের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ২ ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন।এ সময় ঈসা খাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর।তখন বাংলার জমিদারগণ মোঘল ও ইংরেজদের কবল থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে গোপ্তচরের মাধ্যমে ঈশা খাঁকে আফগানিস্থানে খবর পাঠিয়েছিলেন।

ঈশা খাঁ তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আফগানিস্থান হতে ১৪০০ অশ্বারোহী, ২১টি নৌবহর ও পর্যাপ্ত গোলা বারুদ নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে পৌঁছান। ত্রিপুরা রাজ্যে থেকে কিশোরগঞ্জের জঙ্গল বাড়ি দূর্গ দখল করে পরবর্তীতে সোনারগাঁও দূর্গ দখল করেন। তিনি তার যৌবন ভাটিতে কাটিয়েছিলেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন নাম ছিল সূবর্ণ গ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদ রাযের কন্যা ও কেদার রাজার বোন স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করেন। স্বর্ণময়ী পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ঈশা খাঁ তার নাম রাখেন সোনা বিবি। সেই নাম অনুসারে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ের নাম করণ করা হয়।

কররাণী আফগান শাসক তাজ খানের অনুগ্রহে ৩৫ বছর বয়সে ঈশা খাঁ বাংলার কররানী শাসকের সমান হিসাবে সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদী পরগনায় ১৫৬৪ সালে ভিনদেশী হিসেবে তিনগুন মোহর দিয়ে জমিদারি লাভ করেন। তিনি ১৫৭১ খ্রিস্টাদের মধ্যে এত শক্তিশালী হয়ে উঠেন যে, আবুল ফজল তাকে ভাটির শাসকরুপে আখ্যায়িত করেন। ১৫৭৫ সালে তিনি সোনাওগাঁওয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মোঘল নৌবহরকে বিতাড়িত করতে দাউদ খানের সেনাপতিকে সাহায্য করেছিণেন। দাউদ খানের প্রতি কর্তব্য পালনের প্রতিদানে তিনি মসনদ-ই-আলা উপাধি লাভ করেন।

ঈশা খাঁ ও মানসিংহের যুদ্ধঃ

ষোড়শ শতাব্দীর মোঘলদের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষার জন্য বার ভূঁইয়াদের নেতা ঢাকা সোনারগাঁওয়ের বিচক্ষণ ও দুরদর্শী রাজনীতিবিদ সু-শাসক ঈশা খাঁ (সমনদ-ই-আলা) মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে ১৫৯৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন। তখন থেকে সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ভারতীয় উপমহদেশে বাংলার স্বাধীনতার বীজ একমাত্র ঈশা খাঁ বপন করেছিলেন। তার সাহস, বীরত্ব, দেশপ্রেমিকতা নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে মোঘল সাম্রাজ্যবাদ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে ঈশা খাঁর সফল সংগ্রাম তাকে বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলেন। তিনি তার সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদীর জমিদারিকে সাফল্যের সঙ্গে এক স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করেন। এ রাজ্যে বৃহত্তর ঢাকা বেশ কিছু অংশ, প্রায় সমগ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা এবং ত্রিপুরা জেলার এক ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে গঠিত হয়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের খিজিরপুর এবং কিশোরগঞ্জ জেলার জঙ্গলবাড়ি ও এগারসিন্দু ছিল তার শক্তিশালী ঘাটি।

বারভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন তিনি।মুঘল সেনাপতি মানসিংহ জীবনে দুব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারেননি যারা হলেন,চিতরের রানা প্রতাপ সিং ও ঈসা খাঁ।
১৫৭৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলার সুবাদার মুনিম খাঁর মৃত্যু হলে আফগান নেতা দাউদ খাঁ কররানী স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে বাংলা ও বিহারে খুতবা পাঠ করান। স্বাধীন ভূঁইয়ারাও তাঁকে অনুসরণ করে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন।এরপর অনেক বীরত্বগাথাঁ রচিত হয়।সর্বশেষ ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর হতে ১২ মাইল দূরে ঈসা খাঁ,মাসুম খাঁ কাবুলীর সম্মিলিত বাহিনী দুর্জন সিংহকে (মানসিংহের ছেলে) বাধা দিলে দুর্জন সিংহ বহু মুঘল সৈন্যসহ নিহত হন। অনেকে বন্দী হন।
অপরদিকে আরও জানা যায়,লাল মাটি, সবুজ গাছগাছালি আর ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এগারসিন্দুর। এটি ছিল ঈশা খাঁর শক্ত ঘাঁটি। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে এগারসিন্দুর। জনশ্রুতি আছে, বেবুধ নামে এক কোচ উপজাতি প্রধান ষোড়শ শতাব্দীতে এগারসিন্দুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ঈশা খাঁ বেবুধ রাজার কাছ থেকে দুর্গটি দখল করেন এবং একে শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করেন। ১৫৯৮ সালে মান সিংহ দুর্গটি আক্রমণ করেন।

এই এগার সিন্দুরেই ঈশাঁ খা ও মানসিংহের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল।
১৫৯৬ সালে বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁর সঙ্গে মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধ হয় ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলে বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার সর্ব দক্ষিণ প্রান্তের টাঙ্গার গ্রামে। সে সময় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে ছিল রাজা মানসিংহের রাজধানী টোক নগরী। এটির অবস্থান গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে। রাজা মানসিংহ ১৫৯৫ সালে রাজস্থান থেকে তার রাজধানী টোক নগরীতে সরিয়ে আনেন। ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে ছিল টাঙ্গাব গ্রাম ও টোক নগর। ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পাড়ে ছিল ঈসা খাঁর বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দু। ইতিহাস মতে, ঈসা খাঁর অনুপস্থিতিতে মানসিংহ এগারসিন্দু আক্রমণ করেন। সংবাদ পেয়ে দুর্গ রক্ষায় ছুটে আসেন।
কিন্তু তার সৈন্যরা খুবই ক্লান্ত ছিল।তাই ঈশা খাঁ অযথা রক্তপাতের কথা ভেবে মানসিংহকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান করেন। মানসিংহ এ প্রস্তাবে রাজি হন। যুদ্ধে এক পর্যায়ে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈশা খাঁ তাকে আঘাত না করে নিজের তরবারি মানসিংহকে দেন কিন্তু মানসিংহ তরবারি না নিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে আসেন। ঈশা খাঁ তখন মানসিংহকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেন। কিন্তু মানসিংহ তা গ্রহণ না করে ঈশা খাঁকে আলিঙ্গন করেন। তার সাহস ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন।মানসিংহ ঈশা খাঁকে নিয়ে সম্রাট আকবরের দরবারে গেলে তিনি ঈশা খাঁকে ২২ পরগনার শাসক নিয়োগ করেন ও তাকে মসনদ-ই আলা উপাধিতে ভূষিত করে স্বদেশে ফেরত পাঠান।তিনিই বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব।
ঈশা খাঁর দুই পুত্র ছিল মূসা খা এবং মুহাম্মদ। মূসা ঈশা খা র মৃত্যুর পর মসনদে বসেন।

ঈশা খাঁর বিদায় পর্ব:

ঈশা খাঁ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন দূর্গে যাতায়াত করতেন। ১৫৯৯ সালে মহেশ্বরী পরগনার অন্তর্গত বক্তারপুে দূর্গে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৭০ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জে থানায় বক্তারপুর গ্রামে ঈশা খাঁকে সমাহিত করা হয়।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন