কর্মজীবী মানুষের মর্মবেদনা!

0
15

কর্মজীবী মানুষের মর্মবেদনা!

এম হায়দার চৌধূরী, শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ) থেকে:: সারাদেশে করোনা ভাইরাস মহামারীর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার কর্তৃক লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। সারাদেশের ন্যায় হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলাতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। গত ৫ এপ্রিল ২০২১ সকাল থেকে পরবর্তী ৭ দিনের জন্য প্রথম দফা ও ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় দফায় লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ নিষেধাজ্ঞাকে সর্বাত্মক শতভাগ কার্যকরি করার জন্য।

এবারের দফায় দফায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও লকডাউনে নিত্য আয়ের মানুষজনের কাছে যেনো মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো উপস্থিত হয়েছে। লাগাতার নিষেধাজ্ঞায় ওষুধ বিক্রির দোকান আর ভোজ্যপণ্যের দোকান ব্যতীত বাকি সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মানুষকে ঘরে রাখতে চলছে নানা প্রকার প্রশাসনিক খবরদারি। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার শ্রমজীবি সাধারণ মানুষ। আজ ১৫ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের দ্বিতীয়দিন। প্রশাসনিক কঠোর নজরদারিতে সবকিছুতেই স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। কাঁচাবাজার আর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রির দোকান ব্যতীত সব দোকানই বন্ধ রয়েছে।

জানা যায়, হঠাৎ করে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে সংক্রমণ। এ ভাইরাসটি দেশময় লোকালয়ে সংক্রমিত হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। এ প্রেক্ষিতে সরকার আরোপিত স্বাস্থ্যবিধি জনগণ কর্তৃক উপেক্ষিত হওয়ার ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এদিকে প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছে এসব নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে। এরফলে মূলত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষজন। যে মানুষগুলো ঘাম ঝড়ানো পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত টাকা দিয়ে দিনশেষে চাল ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরতো। সে টাকা কামানোর মেশিনগুলো অকেজো হয়ে এখন ঘরবন্দি অবস্থায় অলস সময় কাটাচ্ছেন।

সরজমিনে গিয়ে ঘুরে দেখা যায়, ট্রেনযাত্রী, ফেরিওয়ালা আর ভিক্ষুকের আনাগোনায় কোলাহল মুখর শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে শুনশান অবস্থা বিরাজ করছে। যাত্রীহীন ওই স্টেশনে যাত্রীদের বসার আসনগুলো খালি পড়ে আছে। যাত্রীদের আনাগোনা না থাকায় স্টেশনের মূল ফটকটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। প্লাফরমে অবস্থিত দোকানগুলোতে ক্রেতা বিক্রেতার দেখা মিলেনি। প্লাফরমে জীবিকার তাগিদে জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন রবিদাস সম্প্রদায়ের লোকজন, তারা জানান, রেলওয়ে প্লাফরমে জুতা সেলাই ও রং করার কাজটি মূলত রেলযাত্রীদের উপর নির্ভরশীল। কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বেকার সময় পার করছি। উপরন্তু পরিবারের লোকজনের ভরনপোষণ নিয়ে দুর্ভোগে দিন কাটছে।

উপজেলার দাউদ নগর বাজারের চা দোকানের সামনে পান সিগারেট বিক্রেতা মোঃ হেলালুদ্দিন জানালেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় হোটেল রেস্তোরাঁগুলো তেমন চলছে না। এমনিতে তিনি প্রতিদিন এখানে পান সিগারেট বিক্রি করে ২/৩ শ টাকা আয় করেন এবং এ দিয়ে তার সংসার চলে। গত দশ দিনের লকডাউনে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ঘরে বসে মূলধন ভেঙ্গে সংসার চালাতে হচ্ছে। লকডাউন উঠে গেলে কিভাবে আবার ওই দোকান চালাবেন এ নিয়ে সংশয়ে দিন কাটে তার।

রেলস্টেশনের প্লাটফর্মের ক্ষুদ্র দোকানী শাহ আলম বলেন, রেলগাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় আয় রোজগার নাই। এতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। কবে রেলগাড়ি চালু হবে এবং এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে সে প্রহর গুনছেন তিনি। শায়েস্তাগঞ্জ পুরান বাজারের রিক্সা চালক মতিন জানান, এমনিতে প্রতিদিন ৪/৫ শ টাকা আয় হতো। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাস্তা ঘাটে মানুষজনের চলাফেরা নাই। তাই আয় রোজগারও নাই বললেই চলে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে না খেয়ে থাকতে হবে।

শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন সংলগ্ন পুরাতন কাপড় বিক্রেতা করিমুল জানান, পরিত্যক্ত রেললাইনের উপরে প্রতিদিন পুরনো কাপড় বিক্রি করি। দৈনিক ৪/৫ শ টাকা আয় হয়। তা দিয়ে কোন প্রকারে পাঁচ সদস্যের সংসার চলে। দ্বিতীয় দফা নিষেধাজ্ঞার আজ দ্বিতীয় দিন, গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় ক্রেতা নাই। গত এক সপ্তাহ আয় না থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কবে লকডাউন উঠে যাবে সে প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছি।#

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন