গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও করোনা শনাক্তের কিটের আবিষ্কারের মূল্যায়ন

0
39

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও করোনা শনাক্তের কিটের আবিষ্কারের মূল্যায়ন

—-অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটনঃ

আজ মরণঘাতী করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত পৃথিবীর প্রায় সব দেশ । প্রায় ৩ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে এই করোনা ভাইরাস। বিশ্বের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে শরিক হচ্ছে নতুন লাশ। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। এই রোগের কোন চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি। করোন ভাইরাস শনাক্তের কিটও সহজলভ্য নয়। কিটের অভাবে করোনা রোগীও শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সহ বিশ্বের এই ক্রান্তিলগ্নে করোনা সনাক্তের জন্যে সস্তায় কিট আবিষ্কার করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড. বিজন কুমারের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের গবেষক দল । করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের ‘জিআর
র্্যাপিড ডট বট ইমিউনোঅ্যাসি ‘ কিট তৈরির জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড.বিজন কুমার শীল। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাঈদ জমিরউদ্দীন, ড. ফিরোজ আহমেদ ও সিঙ্গাপুরের জনৈক একজন গবেষক। তাদের এই কিট আবিষ্কারের ফলে সহজ ও স্বল্পমূল্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই গবেষক দল গত ফেব্রুয়ারী মাস থেকেই করোনা শনাক্তের কিট তৈরি ও উৎপাদনের জন্য কাজ করছেন। এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. বিজন কুমার শীল। বিজন কুমার শীল ২০০৩ সালে সার্স পিওসি কিট তৈরি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই কিটের সাহায্যে মাত্র দুইশো টাকা থেকে আড়াইশো টাকায় ১৫ মিনিটে করোনা সনাক্ত করা যাবে।

ড. বিজন কুমার শীল বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যুক্ত রয়েছেন। গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালের প্রধান বিজ্ঞানী। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল । তখন বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল সিঙ্গাপুর গবেষণাগারে কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে সার্স ভাইরাস দ্রুত নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ‘র‌্যাপিড ডট ব্লট’ পদ্ধতিটি ড. বিজন কুমার শীলের নামে পেটেন্ট করা। পরে এটি চীন সরকার কিনে নেয় এবং সফলভাবে সার্স মোকাবেলা করে। ড. বিজন কুমার শীল সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গী নিয়েও গবেষণা করেছেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ব্লাড গ্রুপ যে পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়ে থাকে এটা মোটামুটি সে রকমের একটি পদ্ধতি।
এই কীট ব্যবহার করে মাত্র ৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব। এটা করতে রিএজেন্ট প্রয়োজন । কেমিক্যাল রিএজেন্টগুলো সহজলভ্য নয়। এগুলো পাওয়া যায় সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা ও ব্রিটেনে। যা বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। গণস্বাস্থ্যই এর মার্কেটিং করতে যাচ্ছে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট দিয়ে রোগী নিজেই নিজের পরীক্ষা করতে পারবেন। এখানে ছোট যন্ত্র থাকে যাতে রক্তের নমুনা মিশিয়ে পরীক্ষা করা হয়। করোনা পরীক্ষায় প্রচলিত যে কিট আছে এটা ছোট যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করা যায় না। এটার জন্য পিসিআর প্রয়োজন। কিন্তু এই পিসিআরের মূল্য ৫০ লাখ টাকা।পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত লোকবল। এটা ব্যয়বহুল পরীক্ষা। এই পরীক্ষা করতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খবচ হবে। সময়ও লাগবে ২ থেকে ৫ দিন। কিন্তু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আবিষ্কৃত কিট দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে বলে দেয়া যাবে করোনা হয়েছে- কী হয়নি।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরো জানান, “প্রচলিত ব্যবহৃত কিট খুবই ব্যয়বহুল। আর তার জন্য একটি দামি যন্ত্রের প্রয়োজন। যা সব মেডিকেল কলেজে নেই। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৩টি রয়েছে। সরকারের আইইডিসিআরের কাছে একটি যন্ত্র রয়েছে । অথচ আমাদের পরীক্ষা করা উচিত ছিল হাজার-হাজার। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে প্রতি মাসে ১ লাখ কিট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরও জানিয়েছেন, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন( ডিডিসি) গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাথে এ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিশিষ্ট ভাষা বিজ্ঞানী জ্ঞান তাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, যে জাতি বা সমাজ জ্ঞানী- গুনীর কদর করেনা সে জাতি বা সমাজে জ্ঞানী- গুনীর জন্ম হয় না। বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাস পরীক্ষার যে পদ্ধতি বা কিট আবিষ্কার করেছেন বর্তমান করোনা বিশ্বে তা নজিরবিহীন ঘটনা। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নতুন কিট আবিষ্কার নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচিত হচ্ছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের করোনা শনাক্তের কিট তৈরি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক আবিষ্কার। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের দেশের আর্থ- সামাজিক অবস্থা ও জনসংখ্যা বিবেচনায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহজ ও সুলভ মূল্যের এই কিট ব্যবহার করার বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা ও যথাযথ উদ্যােগ গ্রহণ করতে হবে। এ কিট আবিষ্কারকদেরও যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা বিজ্ঞানী- গবেষকদের মূল্যায়ন জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এধরণের গবেষণা কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহবোধ করবে। অন্যথায় হতাশায় ভোগবেন মননশীল, সৃজনশীল ও গবেষণা প্রিয় জাতির মেধাবী লোকজন।

লেখকঃ শামসুল হুদা লিটন
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, তারাগঞ্জ কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন