ছিল্লা কাইট্টা লবন, লাগালেই চলে জীবন!

0
18

ছিল্লা কাইট্টা লবন, লাগালেই চলে জীবন!

এম হায়দার চৌধূরী, শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ) থেকে:: মচমচে বাদাম, পান সিগারেট ও “ছিল্লা কাইট্টা লবন লাগাইয়া” শশা বিক্রির সুরেলা শব্দ অনেকদিন থেকে কানে বাজেনা। রেলগাড়ির চাকার ঘূর্ণনের সাথে এই মানূষগুলোর জিবনের চাকা ঘুরার একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। সারাদেশে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীর সংক্রমণ ও বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মহামারীর সংক্রমণ ও বিস্তার রোধের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক সারাদেশে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। সারাদেশের ন্যায় হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলাতেও এই সর্বাত্মক লকডাউন বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। গত ২৩ জুলাই ২০২১ সকাল থেকে পরবর্তী ১৪ দিনের জন্য কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, র্যা ব ও সেনা বাহিনী কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এ নিষেধাজ্ঞাকে সর্বাত্মক শতভাগ কার্যকরি করার জন্য।

এবারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও লকডাউনে প্রথমেই বন্ধ করা হয়েছে রেলগাড়িসহ সকল গণপরিবহন। এ পদক্ষেপ নিত্য আয়ের মানুষজনের কাছে এক অজানা আতঙ্কের মতো উপস্থিত হয়েছে। এহেন লাগাতার নিষেধাজ্ঞায় ওষুধ বিক্রির দোকান খোলা থাকলেও ভোজ্যপণ্যের দোকানগুলো আরোপিত বিধি মেনে ৯ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করছে। পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষকে ঘরে রাখতে চলছে নানা প্রকার প্রশাসনিক খবরদারি। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার শ্রমজীবি সাধারণ মানুষজন। প্রশাসনিক ও তিন বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে সবকিছুতেই স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। সকাল-সন্ধ্যা কাঁচাবাজার আর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রির দোকান ব্যতীত সব দোকানই বন্ধ রয়েছে।

জানা যায়, হঠাৎ করে দেশে নতুনধরণ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনেদিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের ভাইরাসটি দেশময় লোকালয়ে সংক্রমিত হচ্ছে দ্রুত গতীতে। এ প্রেক্ষিতে সরকার আরোপিত স্বাস্থ্যবিধি জনগণ কর্তৃক উপেক্ষিত হওয়ার ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এদিকে প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছে এসব নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে। এরফলে মূলত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষজন। যে মানুষগুলো সারাদিন ঘাম ঝড়ানো পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত টাকা দিয়ে দিনশেষে চাল ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরতো। সে টাকা কামানোর রক্তমাংশের মেশিনগুলো এখন ঘরবন্দি হয়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন।

উপজেলার শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে অগণিত মানুষ। ওই রেলস্টেশন কেন্দ্রিক জীবিকা অর্জন করা মানুষগুলো দৃশ্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সরজমিনে স্টেশনে দেখা হয় ২৫/৩০ বছর বয়সের আঃ কুদ্দুছ নামের এক ফেরিওয়ালার সাথে। তিনি ট্রেন আসলেই “ছিল্লা কাইট্টা লবন লাগাইয়া” খিরা/শশাসহ মৌসুমী ফলমূল বিক্রি করে সংসার চালান। ওই খিরা ইত্যাদি বিক্রি করে দৈনিক তার ৩/৪শ টাকা আয় হয়। এতেই কোন রকমে সচল রয়েছে তার সংসারের চাকা। ইদানিং রেলগাড়ির চাকার ঘূর্ণন বন্ধ থাকার সাথে ওই মানূষটির জিবনের চাকা ঘুরার গতি মন্থর হয়ে গেছে। তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন কবে চালু হবে ট্রেন, সচল হবে তার সংসারের চাকা আগের মতো।

শায়েস্তাগঞ্জ জংশন স্টেশনে বেশ কয়দিন থেকে মালবাহী ট্রেন ব্যতীত আর কোন গাড়ি চলাচল করছেনা। এতে যেমনি ঘুরছে না গাড়ির চাকা তেমনি বন্ধ রয়েছে রেলস্টেশন ভিত্তিক খেটে খাওয়া মানুষগুলোর সংসারের চাকা। যে রেল স্টেশনটি কখনো ঘুমায়না সে স্টেশনে এখন শুনশান নিরবতা। সবসময় ট্রেনযাত্রী, ফেরিওয়ালা আর ভিক্ষুকের আনাগোনায় কোলাহল মুখর ছিল শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন। সে জায়গাটিতে শুনশান অবস্থা বিরাজ করছে। যাত্রী বিহীন ওই রেল স্টেশনে যাত্রীদের বসার আসনগুলো উল্টো করে রাখা হয়েছে। যাত্রীদের আসাযাওয়া না থাকায় স্টেশনের মূল ফটকটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। প্লাটফরমে অবস্থিত দোকানগুলোতে লাগানো তালায় ধুলোবালি জমতে শুরু করেছে।

প্লাটফরমে জীবিকার তাগিদে জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন রবিদাস সম্প্রদায়ের লোকজন, তারা জানান, রেলওয়ে প্লাটফরমে জুতা সেলাই ও রং করার কাজটি মূলত রেলযাত্রীদের উপর নির্ভরশীল। চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বেকার সময় পার করছি। উপরন্তু পরিবারের লোকজনের ভরনপোষণ নিয়ে দুর্ভোগে দিন কাটছে। বাজার হাটেও মানুষজন তেমন নাই। মাঝে মাঝে গ্রামে যাই কাজের খোঁজে, সেখানেও কাজ নাই।

রেলস্টেশনের প্লাটফর্মের ক্ষুদ্র দোকানী শাহ আলম বলেন, রেলগাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় আয় রোজগার নাই। এতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। কবে রেলগাড়ি চালু হবে এবং এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে সে প্রহর গুনছেন তিনি।

জামালপুরের বাসিন্দা জনৈক ভিক্ষুক জানান, রেল স্টেশনে আগত যাত্রীদের আর্থিক সহযোগীতায় আমার জীবন চলে। এখন স্টেশনে লোকজনের যাতায়াত না থাকায় আমাদের আয় রোজগার একেবারেই নাই। রাতেরবেলা স্টেশনে রাত কাটাই আর সারাদিন দোকানে ও গ্রামে গিয়ে খাবার চেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করি। অপেক্ষায় আছি আবার কবে ট্রেন সচল হবে আমাদেরও দুঃখের দিনের অবসান হবে।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন