নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ধনবাড়ি টাঙ্গাইল

0
1

আরিফুর রহমান খানঃ নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী

টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি প্রসিদ্ধ জমিদার পরিবারে ১৮৬৩ সনের ডিসেম্বরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ভূমিষ্ঠ হন তাহাঁর মাতৃলয়ে রাজশাহী জেলার নাটোরে। তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও কলেজে শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৯৫ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত তাহাঁর কর্মতৎপরতা ছিল প্রধানত সাহিত্য, সংস্কৃতি কেন্দ্রিক। এই সময় তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। ১৯০৫ সাল থেকে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯০৮ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে স্ত্রী শিক্ষার উন্নতিকল্পে পূর্ব বঙ্গ ও আসাম প্রদেশ সরকার কতৃক রবার্ট ন্যাথানের নেতৃত্বে
” ফিমেল এডুকেশন কমিটি ” গঠন করা হয়। এই কমিটিতে নবাব বাহাদুর সলিমুল্লাহ ও নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী সদস্য নিযুক্ত হন। এই কমিটি ভারত গভর্নমেন্টের কাছে প্রেরণ করলে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই কমিটিতে আরো অনেকে বিখ্যাত ব্যাক্তি ছিলেন। এই সময়েই এই কমিটির অধীনে সাব কমিটি
” মোহামেডান ফীমেল এডুকেশন ” গঠন করা হয়। নবাব বাহাদুর খাজা সলিমুল্লাহ ও নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরীকে সাব কমিটির প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। তাহাঁরা উভয়ে এবং নবাব সামসুল হুদা সহ নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই কমিটি ঢাকায় ইডেন স্কুল ও স্কুল সংলগ্ন একটি উত্তম মুসলিম মহিলা হোষ্টেল নির্মাণের উপলব্ধি করেন। রংপুর ও কুমিল্লায় পর্দা প্রথা রক্ষা করে মুসলিম বালিকারা শিক্ষা পেতে পারে তার সুপারিশ করেন। ১৯১১ সালে নবাব সলীমুল্লা ও নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সকল বাধা অতিক্রম করে এবং তাহাঁদের বিরাম হীন চেষ্টার ফলে ১৯১১ সালের ৩১ শে জানুয়ারী লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাতে না হতে পারে তার জন্য এদেশীয় কিছু সম্ভান্ত মানুষ চরম বিরোধিতা শুরু করে। ১৯১২ সলের ১লা এপ্রিল উভয় বঙ্গে ঢাকা বিভাগের জেলাবোর্ড সমূহের প্রতিনিধিরুপে বঙ্গ প্রেসিডেন্সীর আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯১৬ সাল পর্যন্ত সদস্য ছিলেন। নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী বঙ্গ ও আসাম প্রেসিডেন্সীর সভার মোসলমানদের শিক্ষার উন্নতি, স্ত্রী শিক্ষার প্রসার, ছাত্রবৃত্তি, ছাত্র ভর্তি, আবাসিক সমস্যার সমাধান, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন ও মোসলমানদের চাকরির বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে মাদকাসক্তির কথা তুলে ধরে আবগারি ব্যবসার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনিঁ পূর্ব বঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিরূপে ভারতীয় আইনসভার সদস্য হন। ১৯১৬ সালের এপ্রিলে আইন সভার বাজেটে অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ অতি দ্রুত সম্পুর্ন করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি স্টাডিজের বিশেষ ফ্যাকালটি স্হাপনের দাবী পেশ করেন। এবং তিনিঁ যুক্তি দিয়ে ইসলামি স্টাডিজ বিভাগ রাখার বিষয় তুলে ধরেন। ১৯১৬ সালে ১৯ জন বেসরকারি আইনসভার সদস্য ভাইসরয়ের নিকট স্মারক লিপি পেশ করে ঐ স্মারক লিপিতে মোসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের স্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী সাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। তিনিঁ ১৯১৯ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান যিনি মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৯২৩ সাল পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রীর দ্বায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৯ সালে সিরাজগঞ্জে আঞ্জুমানে ওয়ায়েজিন এর দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে বাংলার প্রায় সকল উচু শ্রেনীর নেতৃবৃন্দ বলেছিল বাংলা নয় উর্দু হবে মাতৃভাষা তখন একমাত্র নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী উচ্চ স্বরে রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন উর্দু নয় বাংলা হবে আমাদের মাতৃ ভাষা কারন বাংলাই অামাদের মায়ের ভাষা। ১৯২১ সালে জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথারীতি ক্লাস শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টাকালে অর্থাভাব দেখা দিলে নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী ৩৫০০০ টাকা প্রদান করেন যাহা বর্তমান টাকায় ( আট কোটি টাকার চেয়ে বেশি ) এবং ছাত্র বৃত্তি বাবদ ১৬০০০ টাকা দান করেন যাহা বর্তমান টাকায় ( চার কোটি টাকার চেয়ে বেশি )। ১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করার জন্য লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন।
আজ একটি কথা বলতেই হয় সেদিন নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী উদ্দোগ না নিলে হয়তো সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতো না। নবাব সলীমুল্লা জীবিত থাকা অবস্হায় দেখে যেতে পারেন নাই। আজ অনেকেই জানেনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতা কে ?
১৯২৯ সালে হজ্জ যাত্রীদের প্রতি বিদায় সম্ভাষণ জ্ঞাপন জানাতে ষ্টীমারে গিয়ে ভীষণ ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে নিউমোনিয়া ১৭ এপ্রিল ১৯২৯ দার্জিলিংয়ে নিজ বাসভবন ইডেন ক্যাসেলে ইন্তেকাল করেন। তাহার মৃত্যুর পরে বড়োলাট আদেশ দেন বাংলার সমস্ত অফিস বন্ধ থাকবে এবং সরকারি অফিসে পতাকা অর্ধ উত্তলিত থাকিবে। তাহার মরদেহ তাহার প্রিয় ধনবাড়ি সমাহিত করা হয় এবং তাহাঁর ওসীয়ত মোতাবেক মৃত্যুলগ্ন থেকে অদ্যাবধি তারঁ মাষারে দুইজন হাফেজ কুরআন তিলাওয়াত করে আসছেন।
বৃটিশ গভর্নমেন্ট স্বদেশ, স্বজাতি, শিক্ষা সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯০৬ সালে খান বাহাদুর, ১৯১১ সালে নবাব, ১৯১৮ সালে সি,আই, ই এবং ১৯২৪ সালে নবাব বাহাদুর খেতাবে ভূষিত করেন।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন