ব্যবহার ও চাহিদা না থাকায়, হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প!

0
6

এম হায়দার চৌধুরী (হবিগঞ্জ):: হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার মৃৎশিল্পীদের তৈরি জিনিসপত্রের বাজারে চাহিদা না থাকায় পেশা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। উপজেলার সুতাং এলাকায় অবস্থিত সুতাং কুমার পাড়ায় মাটির তৈরি জিনিস এবং কারিগরদের দুর্দিন যাচ্ছে। আধুনিকতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে কদর কমে গেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের।

তথ্যে জানা যায়, মৃৎশিল্প হলো বিশেষ এঁটেলমাটি বা কাদামাটি ইত্যাদির সাহায্যে গৃহস্থালি ব্যবহা্র্য হাড়ি-পাতিল ও বিভিন্ন সৌন্দর্য বর্ধনের জিনিসপত্র তৈরি করার শিল্প। এদের তৈরিকৃত বস্তুগুলো টেকসই ও মজবুত করার জন্য উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। যে কারিগররা মাটি দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করেন তাদেরকে কুম্ভকার বা প্রচলিত ভাষায় কুমার নামে অভিহিত করা হয়। যে কারখানায় তারা এগুলি তৈরি করেন তাকে কুম্ভশালা বা কুমারশালা বলা হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদ্যায়, বিশেষ করে প্রাচীন এবং প্রাগৈতিহাসিক যুগে শুধুমাত্র পাত্র-কে মৃৎশিল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং একই উপাদান দ্বারা তৈরি অন্যান্য গঠনকে টেরাকোটা বলা হয়। মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপাদান হিসেবে কাদামাটির ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার নুরপুর ইউনিয়নের সুতাং বাজার সংলগ্ন ২ শতাধিক বছর পূর্বে গড়ে উঠে কুমার পাড়ার অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে। এ কুমার পাড়ায় বসবাসরত লোকজন বংশানুক্রমে মাটি দিয়ে কলস, হাঁড়ি পাতিল, মটকা, বিভিন্ন প্রকার পুতুলসহ নানান ধরণের গৃহস্থালি জিনিস তৈরি করে আসছেন। তারা পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে এগুলো বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। কালের বিবর্তনে কুমারদের তৈরি মাটির গৃহস্থালি সামগ্রীর স্থান দখল করেছে এলুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও স্টিলের তৈরি জিনিসপত্র। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্লাস্টিকে তৈরি দ্রব্যাদি মৃৎশিল্পের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছে।

আধুনিকতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে যুগের চাহিদা অনুযায়ী এসব মাটির তৈরি জিনিস পত্রের চাহিদা ও ব্যবহার না থাকায় এর মূল্য হ্রাস পেয়েছে দ্রুত গতিতে। দৃশ্যমান শত প্রতিকূলতার মাঝেও কুমাররা তাদের পূর্বপুরুষের পেশায় টিকে থাকার অসম প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে।

জানা গেছে, উল্লেখিত কুমার পাড়ার বাসিন্দারা শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার দাউদনগর বাজার, পুরান বাজার, সুতাং বাজার, আলিপুর, শাহজীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করে আসছে। ক্রেতাদের ওইসব মাটির তৈরি জিনিসপত্রের প্রতি এখন আগের মতো আগ্রহ নেই বললেই চলে। তবুও পেশা পরিবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত এ পেশায় নিরন্তর চলতে হবে।

কুমার পাড়ার কয়েকজনের সাথে আলাপচারিতায় তারা জানায়, বৈশ্বিক আধুনিকায়নের গতিতে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের জীবনচক্র। তাই তাদের তৈরি মাটির জিনিস এখন তেমন একটা বিক্রি হচ্ছে না। তারপরও গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প পেশাকে ধরে রাখতে অবিরাম ছুটে চলেছি।

তিনি আরো বলেন, একসময় মাটির তৈরি কলস হাড়ি পাতিল খেলনা ফুলের টবের খুব কদর ছিল। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিপন্ন হতে বসেছে এ মৃৎশিল্পসহ শিল্পীরা। তাছাড়াও বর্তমান আধুনিক যুগের প্লাষ্টিক সামগ্রীসহ অন্যান্য জিনিস পত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় এই শিল্পে ধ্বস নেমেছে। মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত কুমার পরিবারগুলো আর্থিক সংকটসহ নানান অভাব অনাটনে, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মৃতশিল্প পেশা থেকে।

মৃৎশিল্পের কারিগর কালিদাস পাল বলেন, অর্থের অভাবে এখানকার কুমার পরিবারগুলো কিনতে পারেনা কোন আধুনিক মেশিন ও সরঞ্জাম। যার জন্য অনেকেই এ পেশা ছেড়ে এখন কৃষি কাজসহ বিভিন্ন পেশার দিকে চলে যাচ্ছে।

সমাজের সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সহস্র বছরের লালিত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্রময় পেশার এই দেশে কোন পেশা হারিয়ে যাবে এটা কাম্য নয়। মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত কারিগরদের সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক আর্থিক অনুদান পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এ পেশাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। হাজার বছরের এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে এ শিল্প সংশ্লিষ্ট খেটে খাওয়া মানুষেরা।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন