শিক্ষক ট্রান্সফারের খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষার্থীরা

0
124

ডেস্ক রিপোর্টঃ শিক্ষকদের মনের আকাশে জমে মেঘ, কর্মকর্তা কর্মচারীরা আড়ালে ফেলেন চোখের জল। যেন এক রুপকথার গল্প। শোনার পরে ঘিরে থাকবে একরাশ মুগ্ধতা। রংপুরের দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যান্ড কলেজের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ নাজমুর রহমান। যিনি গোটা প্রতিষ্ঠানটি সাজিয়েছেন রুপকথার মতো। যিনি অধ্যক্ষ হয়েও ক্যান্টিনে গিয়ে সিঙ্গারা বিক্রি করতে পারেন, মাঠে নেমে পড়তে পারেন বাচ্চাদের সাথে কানামাছি খেলতে কিংবা অনুষ্ঠানে আয়োজনে র‍্যালিতে রিকশা ভ্যান নিজেই চালিয়ে যেতে পারেন। এমনই একজন অভিভাবকের যখন ট্রান্সফারের সংবাদ আসে স্বাভাবিকভাবেই চোখের জল কেউ ধরে রাখতে পারেন না। তাহলে ছোট ছোট শিশুরা কীভাবে পারবে। বিদায়ের খবর শুনে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থীরা। অফিস কক্ষে এসে ঘিরে ধরে প্রিয় স্যারকে। কিন্তু উপায় কী? তাহলে কী এতোগুলো মানুষের ভালোবাসা, চোখের জল বৃথা হয়ে যাবে? শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়নি। তার আগে আসুন লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ নাজমুর রহমানের আবেগ ঘন ফেসবুক পোস্টটি পড়ি। যেটি তিনি নিজের ফেসবুক হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন। তিনি ভালোবাসাকে শিরোনাম করেছেন ‘সর্বনাশা ভালবাসার অরুনিমায়…’ তিনি লিখেছেন তা হুবহু এমন , এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ‘জন্মিলে মরিতে হইবে’, এটাই তো চিরন্তন সত্য। পুরনো প্রাণের প্রস্থান না হলে কিভাবে নতুনের আগমন ঘটবে। পেশাগত দিকে আমি একজন আর্মি অফিসার, আমার কৈশোর পেরুনো দিনগুলো থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ আর রীতিনীতির মাঝে অতিবাহিত হতে থাকে সময়। এভাবেই একে একে যৌবন, মধ্যবয়স পেরিয়ে বেলাশেষের প্রস্তুতি গ্রহণকালে হঠাৎ পোস্টিং হয়, দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল এন্ড কলেজ, রংপুর এর অধ্যক্ষ হিসেবে। পোস্টিং অর্ডার শোনার সাথে সাথে মনটা অনিশ্চয়তায় কেঁপে উঠল। খুবই চিন্তিত হলাম, আমি কেমন করে এই দায়িত্বটা পালন করব। এই পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন জ্ঞান-তো আমার নেই। সেদিন আমার স্ত্রী আমার পাশে বসে পরম নির্ভরতার সাথে বলেছিল, পোস্টিংটা স্বাভাবিকভাবেই নাও। যারা তোমাকে পোস্টিং করেছেন নিশ্চয়ই ভাল কিছু চিন্তা করেই করেছেন। ওর কথা শোনার পর মন খারাপের রেশটা কেটে গেল। সামরিক পেশায়, পেশাগত প্রয়োজনেই আমাদের কিছুটা রুথলেস হতে হয়। এখানে আমাদের শেখানো হয় প্রতিপক্ষের মৃত্যুকে স্বাগত জানাতে। এক বুলেট, এক শত্রু- এই মূলমন্ত্রে নিজেদের শাণিত করতে আমরা ফায়ারিং রেঞ্জে অনবরত গুলি ছুড়ি লক্ষ্যবস্তুর দিকে। কাল্পনিক শত্রুকে নানান আকৃতির বানিয়ে- দাঁড়ানো, বসা, শায়িত ভঙ্গিতে রুপ দিয়ে আমরা ছুড়তে থাকি বুলেট। পরিস্থিতি ও কৌশলের প্রয়োজনে আমরাও পরিবর্তন করি আমাদের অবস্থান- কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বসে, কখনও হাঁটু গেড়ে, কখনও শুয়ে ছুড়তে হয় গুলি। বছরের পর বছর চলে এমন প্রশিক্ষণ। মৃত্যু, আর্তচিৎকার, রক্তক্ষরণ এগুলো সামরিক জীবনের/যুদ্ধক্ষেত্রের নৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিপক্ষকে যত দ্রুত ঘায়েল করা যায়, ততই ত্বরান্বিত হয় কাংখিত বিজয়। এমন সব কাজের জগত থেকে হঠাৎ শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে নতুন কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমার নতুন দায়িত্বের কথা শুনে আমার কিছু বয়োবৃদ্ধ আত্মীয় বললেন, আর্মি-কি তোমাকে রিটায়ারমেন্টে পাঠিয়ে দিল? আমি হেসে বললাম, না, ওনারা হয়ত আমাকে দিয়ে শত্রু মারার চেয়ে মানুষ গড়ার কাজটা করাতে চাচ্ছেন। রংপুরে এসে পৌঁছলাম, ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি তারিখে। আমাকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত সামরিক গাড়ির চালককে বললাম,’আমাকে প্রথমে মিলেনিয়াম স্টারস স্কুলে নিয়ে যাবে।’ চালক বলল- ‘স্যার, রাতে তো তেমন কিছুই দেখা যাবেনা।’ আমি মৃদু হেসে বললাম, ‘তোমার কথাটা ঠিক, তারপরও আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। কারণ, আমি আমার জন্য নির্ধারিত অফিসার্স মেসের কক্ষে ঢোকার আগে, সেই স্থানের মাটিকে স্পর্শ করতে চাই, যেখানে আমার সামনের কয়েকটি দিন জড়িয়ে থাকবে।’ রাত সাড়ে নয়টায় আমরা পৌঁছলাম আমার নতুন ঠিকানা- দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল ও কলেজের সীমানায়। জানুয়ারি মাসের শীতের রাত। কনকনে শীত। স্কুলের কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরী এসে জানতে চাইল পরিচয়। রাতের আঁধারে অস্পষ্ট স্কুল ভবনটির মতো আমিও ওর কাছে কিছুটা অস্পষ্ট থাকতে চাইলাম। বললাম, ‘নতুন এসেছি রংপুরে, শুনলাম স্কুলটা ভাল, বাচ্চাদের ভর্তি নিয়ে চিন্তায় আছি, তাই একনজর এই স্কুলটা দেখতে এসেছি।’ নিরাপত্তা প্রহরী বলল- ‘দিনের বেলা আসেন, ভাল করে দেখেন, স্যারদের সাথে কথা বলেন, স্যাররা দেখবেন ভর্তি করা যায় কিনা?’ ও তখনো জানেনা, তাঁর সাথে কথোপকথনরত এই লোকটিই সামনের দিনগুলোতে এই স্কুল ও কলেজের সকল কার্যক্রমের সাথে মিশে যাবেন তাদেরই একজন সহকর্মী হয়ে কিছুদিনের জন্য। গাড়ী বারান্দার পিলারটি স্পর্শ করে কাল্পনিক একটা অনুভূতির শিহরণ অনুভব করলামে। কিছুটা এদিক ওদিক উঁকি মেরে দেখলাম, ধীরে ধীরে হাটলাম, তারপর চললাম… অফিসার্স মেসের দিকে। খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম, খেলার মাঠটি নানান ধরণের নির্মাণ সামগ্রীতে ভরপুর দেখে। শিশুর প্রথম চাহিদাই তো ছুটাছুটির একটু জায়গা…। প্রজাপতির মতো উড়তে পারা… ফড়িং এর লেজ আর পাখনা ধরে টানাটানি করা…ঘাসে আর মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে জামা ময়লা করে বাসায় ফিরে মায়ের বকা খাওয়া…। শৈশবে একটুকরো রঙিন দিন পাওয়া ওদের অধিকার…। কারো দয়া নয়। পরদিন স্কুলে এসে তৎকালীন প্রিন্সিপাল সাঈদ আহমেদ স্যারের সাথে দেখা করলাম। স্যার ও ভিপি ম্যাডাম আন্তরিকতা নিয়ে আলাপ করলেন। যেহেতু স্যার তখনও দায়িত্বে ছিলেন তাই আমি অনানুষ্ঠানিকভাবে স্কুলের বিভিন্ন অংশ ঘুরে ফিরে দেখছিলাম ও ধীরে ধীরে আমার মানসপটে আঁকতে শুরু করেছিলাম কল্পনার আলপনায় কিছু উচ্চাভিলাষী দৃশ্য। পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠবে মানবিক গুণাবলি নিয়ে। খেলাধুলা করে মজবুত শারীরিক গঠন নিয়ে ওরা তৈরী হবে তেজোদীপ্ত নাগরিক হিসেবে, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হবে আমাদের সোনামনিরা। ওরা জানবে সমাজে মাথা উঁচু করে বাচঁতে হলে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলে হবেনা, ভাবতে হবে আমাদের চারপাশ নিয়ে। মানুষের কষ্টে চুপ করে থাকা যাবেনা। নৈতিকতা আর চারিত্রিক মূল্যবোধের আলো

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন