শ্রীপুর চুরির অভিযোগে দুই শ্রমিক নির্যাতন, মামলা নিতে পুলিশের কালক্ষেপণ

0
11

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার সিংগারদিঘী গ্রামের  ফিসপার্কের ভেতরে চুরির অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে দুই নির্মাণ শ্রমিককে নির্যাতন করেছে ওই পার্কের ম্যানেজার, কর্মচারী ও এলাকার প্রভাবশালী কয়েকজন।
থানায় মোট দুইটি অভিযোগ দেওয়া হলেও একটি অভিযোগের মামলা নেওয়া হয়েছে। অপর অভিযোগ তদন্তে গাফিলতি করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মহসিন।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা হলেন, উপজেলার সিংগারদিঘী গ্রামের শহিদুলের সন্তান মোশারফ হোসেন (২৫) ও একই গ্রামের মৃত মাসুদ রানার সন্তান সিজন (১৪)।

তাদের পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ চুরির কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকা স্বত্বেও তাদেরকে বাড়ি থেকে ধরে ফিস পার্কের ভেতরে নিয়ে ব্যাপক মারধর করে অভিযুক্তরা।

চোর সন্দেহে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে শুক্রবার [৩০ অক্টোবর ২০২০] সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত নির্যাতন চালায় অভিযুক্তরা।

অভিযুক্তরা হলেন, ফিসপার্কের ম্যানেজার সোহরাব (৩২), পার্কটির কর্মচারী নজরুল ইসলাম (৩৬), লিটন (৩২), রফিকুল ইসলাম (৫০), আলমীর (৪০), সিংগারদিঘী গ্রামের মৃত হবি ভূইয়ার সন্তান আবুল হোসেন ভূইয়া (৪০) ও একই গ্রামের মৃত নূরু ভূইয়ার সন্তান আলম ভূইয়া (৪৫)।

ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগ, সিজন ও মোশারফ হোসেন এলাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় [৩০ অক্টোবর ২০২০] কাজের কথা বলে তাদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় এগ্রো প্রজেক্টের কর্মচারী নজরুল ইসলাম। পরে সেখানে থাকা ম্যানেজারের আদেশে অন্য আরও চার-পাঁচজন কর্মচারী মিলে তাদের দুজনকে চুরির অপবাদ দিয়ে ব্যাপক মারধর করে। নির্যাতন শেষে পরদিন সকালে দুজনকে বাড়ির পাশে অচেতন অবস্থায় ফেলে দিয়ে যায় এগ্রো প্রজেক্টের কর্মচারীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘটনার প্রতক্ষদর্শী কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদেরকে মারধর করার সময় এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী মোশারফের উভয় হাতের চামড়ার ভেতরে চার ইঞ্চি তারকাঁটা ঢুকিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, কাটিং প্লাস দিয়ে বা হাতের নখ উপরে ফেলে, ভুক্তভোগী মোশারফ ও সিজনের ব্যাপক চিৎকারেও মন গলেনি তাদের! মাথার চুল কেটে দেয় এবং পায়ের উভয় হাঁটুর নিচে রোড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে, একের পর এক জলন্ত মশার কয়েল পিঠে ও পায়ের তলায় ঠেসে ধরে। এভাবেই রাতভর নির্যাতন চালায় তারা।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী মোশারফের পিতা শহিদুল ইসলাম ও সিজনের মা রিনা আক্তার বাদি হয়ে শ্রীপুর থানায় দুইটি আলাদা অভিযোগ দায়ের করেন। রিনা আক্তারের দেওয়া অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলা নিলেও অপর অভিযোগের মামলা নেয়নি পুলিশ।

লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের মারধরের যথেষ্ট প্রমাণ থাকা স্বত্বেও অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও থানার ওসি শুরু থেকেই টালবাহানা করে আসছে।

এ বিষয়ে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে গত বুধবার  [৪ নভেম্বর ২০২০] “দুই শ্রমিককে রাতভর নির্যাতন, মামলা নিচ্ছে না পুলিশ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনে ওসি খোন্দকার ইমাম হোসেন প্রশ্নবিদ্ধ বক্তব্য দিয়েছেন।

তিনি ওই বক্তব্যে আমাদের সময় প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা দুইজন চোর! চুরির অপরাধে স্থানীয়রা তাকে মারধর করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দিলেও চোরের পক্ষে মামলা রুজু হবে না।’

গণমাধ্যমকে দেওয়া ওসির এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে দৈনিক খোলা কাগজের স্টাফ রিপোর্টার তানজেরুল ইসলাম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। ও-ই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন: “শ্রীপুর থানার ওসি সাহেব। বিষয়টি ক্লিয়ার করবেন কি ? আইন হাতে তুলে নিয়ে কথিত চোরদের কি পিটিয়ে আহত করা যায় ? কথিত চুরি অভিযোগ এবং চুরি অপরাধের মধ্যে কি ব্যবধান রয়েছে ? চুরি অপরাধে কি স্থানীয়ভাবে সাজা প্রদানের সুযোগ রয়েছে ? সংবিধানে চোরদের কি আইনগত সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই” ?

দৈনিক আমাদের সময়ে খবর প্রকাশ হওয়ার পর ভুক্তভোগী সিজনের মায়ের করা অভিযোগকে আমলে নিয়ে বিভিন্ন টালবাহানার পর মামলা নেয় শ্রীপুর থানা পুলিশ। মামলা নম্বর ১৫। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম এসআই অশোক কুমার সরকার।

এ ব্যাপারে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর বডিতে মারধরের সিনড্রোম রয়েছে। বিষয়টা এখনও তদন্তাধীন। বিস্তারিত পরে জানানো যাবে। আরেকটি অভিযোগ প্রসঙ্গে আমার জানা নেই।

অপর অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মহসিনের নিকট মোশারফের পিতা শহিদুল ইসলামের দেওয়া অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওখানে গিয়েছিলাম, নাম কি সঠিক বলতে পারছিনা! ওরা চুরি করছিল! মারামারিও হইছে! মুচলেকা দিয়া ছুইট্টা গেছে”! মুচলেকা দেওয়ার প্রমাণ কি আপনি তদন্ত করে পেয়েছেন ? প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “বিষয়টা ওসি স্যার জানে, ওসি স্যারের সাথে কথা হইছে”! এই অভিযোগ কি মামলা হওয়ার মতো বিষয় ? আপনার কাছে কি মনে হচ্ছে ? এর উত্তরে তিনি তোতলানো কন্ঠে বলেন, “না। মামলা হয়নি। না মামলা হবে হবে কেন? তারা চুরি করতে গেছিল! তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে”। কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ? পরে তিনি বলেন, না। “কোনও পক্ষেই মামলা হয়নি”। ওসি কি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন ? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।

এ বিষয়ে ফিসপার্ক এগ্রোপ্রজেক্টের ব্যবস্থাপক সোহরাব হোসেন জানিয়েছেন, ‘চুরি সন্দেহে তাদেরকে আটক করে মারধর করা হয়েছে, আমরা অন্যায় করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে’।

মাওনা ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি আইয়ুব হাসান ভূইয়া এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, “তারা চুরি করেছে। মাওনা পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই রাসেলের সামনেও চুরির স্বীকারোক্তি দেয়। চোর ধরলে তো মারধর করবেই। চোরদের কি চুমা দিবে ? চোরদের তো মেরেও ফেলে, আপনি জানেন না”? এ-ই কথা বলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।

এ ব্যাপারে মাওনা পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই রাসেল জানিয়েছেন, “আমাকে আইয়ুব ভূইয়া মোবাইলে এ ব্যাপারে জানানোর পর আমি সকালে তার বাড়িতে যাই। যাদেরকে মারধর করেছে তাদেরকে আহত অবস্থায় দেখি আ.লীগ নেতা আইয়ুব হাসানের বাড়িতে। তখন, চুরির অপরাধে তাদেরকে নিতে বলে আইয়ুব হাসান, পরে ওসি স্যারের নির্দেশে আমি বলি, তাদেরকে আগে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তারপর থানায় এজাহার দেন। তখন, আহতদের বিরুদ্ধে এজাহার দেওয়ার মতো কাউকে আমি পাইনি”।

এ ব্যাপারে শ্রীপুর থানার ওসি খোন্দকার ইমাম হোসেন জানিয়েছেন, “মামলা হইছে। আমরা তদন্ত করে দেখতেছি। নিয়মমতো যেটা করা দরকার করবো”। মামলা কি একটা হয়েছে না-কি দুইটা ? এমন প্রশ্নের পর ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন