সাদুল্লাপুরে সালিশি বৈঠকে দরিদ্র পরিবারকে গ্রাম ছাড়াকরার সিন্ধান্ত ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

0
6

সাদুল্লাপুরে সালিশি বৈঠকে দরিদ্র পরিবারকে গ্রাম ছাড়াকরার সিন্ধান্ত ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

সুমন সরকার গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
প্রেমের টানে পালিয়ে যায় ছেলে-মেয়ে। মেয়ের প্রভাবশালী পরিবার ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলের রিক্সাচালক বাবাকে রাতভর আটকে রেখে চালায় নির্যাতন। ঘটনার ৫ দিন পর মেয়েকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও সালিশ বৈঠকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে ছেলের বাবা ছকু মিয়াকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে গ্রাম ছাড়ার সিন্ধান্ত দেয় গ্রাম্য মাতব্বররা। জরিমানার সেই টাকা সংগ্রহে ঢাকায় গিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান ছকু মিয়া। বর্তমানে প্রভাবশালী মেয়ের পরিবার ও গ্রাম্য মাতব্বরদের হুমকি-ধামকিতে এলাকা ছাড়া ছকু মিয়ার দুই ছেলে-মেয়ে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সম্প্রতি ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের পূর্ব দামোদরপুর গ্রামে।

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় এলাকাবাসীর সঙ্গে। তারা জানায়, পূর্ব দামোদরপুর (পুটিমারি) গ্রামের রিক্সাচালক ছকু মিয়ার গামেন্টস শ্রমিক ছেলে মোজাম্মেল হকের সঙ্গে কয়েক বছর আগে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে প্রতিবেশি প্রভাবশালী মন্টু মিয়ার স্কুলপড়ুয়া মেয়ের। প্রেমের টানে তারা দু’জনে গত ১৫ মে পালিয়ে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রভাবশালী মন্টুসহ তার পাঁচ ভাই মিলে রিক্সাচালক ছকু মিয়াকে ধরে নিয়ে বাড়িতে আটকে রাতভর নির্যাতন করে। একদিন পর জরুরী সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশের সহায়তায় ছকু মিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর মেয়েকে অপহরণের অভিযোগে সাদুল্লাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন প্রভাবশালী মন্টু মিয়া।

তারা আরও জানান, ঘটনার ৫ দিন পর গাজিপুরের মৌচাক থেকে প্রেমিকাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় বাড়িতে। পরে প্রভাবশালী মেয়ের পরিবার সালিশ বৈঠক ডাকেন। গ্রামের পেস্তা ডাক্তারের বাড়িতে স্থানীয় চেয়ারম্যান এজেডএম সাজেদুল ইসলাম স্বাধীনের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠক হয়। সালিশে রিক্সাচালক ছকু মিয়ার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে গ্রাম ছাড়ার রায় দেওয়া হয়। জরিমানার সেই টাকা সংগ্রহে ঢাকায় গিয়ে গত ৩ জুন দুপুরে মারা যান ছকু মিয়া। পরে ছকুর লাশ বাড়িতে নিয়ে আসার পর আবারও সালিশ বৈঠক বসিয়ে প্রভাবশালী ছয় ভাই ৭০ হাজার টাকা ছকুর পরিবারকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করা হয়।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, রাতভর আটক রেখে ছুক মিয়াকে বেধরক মারধরসহ নির্যাতন করে মেয়ের বাবা মন্টুসহ তার পাঁচ ভাই। এছাড়া সালিশে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আর গ্রাম থেকে বিতাড়িত হওয়ার চাপ-অপমানেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ছকুর ছেলে মোজাম্মেল হকের অভিযোগ, জরিমানার টাকা পরিশোধে তাদের একটি মাত্র ঘরও বিক্রি করে দেয় পরিবারটি। দাফনের আগে ঘরে আটকিয়ে রাখায় শেষ দেখাসহ বাবার কবরে মাটিও দিতে দেওয়া হয়নি তাকে। প্রভাবশালী মেয়ের পরিবারের সদস্যদের হুমকিতে বর্তমানে একমাত্র বোনকে নিয়ে তাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তাও অজানা ছকু মিয়ার ছেলে মোজাম্মেল হকের। বাবার মৃত্যুর ঘটনার বিচার চেয়ে প্রভাবশালী পরিবারটির বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও জানান তিনি।

এদিকে, ছেলের প্রেমের খেসারতে বাবার মৃত্যু, সালিশে জরিমনা ও দরিদ্র পরিবারটিকে গ্রাম ছাড়ার সিন্ধান্তের ঘটনায় নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।

তারা বলছেন, প্রভাবশালী ওই পরিবারের সাত ভাইয়ের ছয়জনই দাদন ব্যবসায়ী। তাদের প্রভাব আর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন গ্রামের অনেকেই। বর্তমানে প্রভাবশালী পরিবারটি সালিশকারীদের সহায়তায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। কয়েক দফার সালিশ বৈঠকে জড়িতসহ অভিযুক্ত প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি সালিশ বৈঠক বসা বাড়ির মালিক পেস্তা ডাক্তারসহ গ্রাম্য মাতব্বরদের। সালিশে উপস্থিত থাকা দামোদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম স্বাধীনকে পাওয়া যায়নি তার ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও। তবে মুঠফোনে তিনি উভয়ের সম্মতিতে ঘটনাটি সমাধানের দাবি করেন। এছাড়া অভিযুক্ত প্রভাবশালী পরিবারের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। তবে ঘটনার বিষয়ে তাদের কিছুই বলার নেই বলে জানায় আলমগীর।

ঘটনাটি জানা আছে স্থানীয় প্রশাসন-পুলিশের। বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নবীনেওয়াজ। আর লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় সাদুল্লাপুর থানার (ওসি, তদন্ত) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

আপনার মতামত প্রকাশ করেন

আপনার মন্তব্য দিন
আপনার নাম এন্ট্রি করুন