সাবেক ডিসি সারওয়ার আলমের প্রবাসী-কেন্দ্রিক স্বপ্ন: ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি থেমে যাবে?

মোঃ নাসির, নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র) প্রতিনিধি
সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ সারওয়ার আলমের সময় প্রবাসী-বান্ধব উন্নয়ন ধারণা ও বিনিয়োগমুখী পরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় ও প্রবাসী মহলে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর বদলির পর এখন অনেক প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকের মনে প্রশ্ন—এই প্রবাসী-কেন্দ্রিক স্বপ্ন ও উদ্যোগগুলোর কি ধারাবাহিক বাস্তবায়ন হবে, নাকি নতুন ডিসি এলে সেগুলো স্তিমিত হয়ে যাবে?
প্রবাসীদের সম্পৃক্ততার যে ভাবনা
সারওয়ার আলম সিলেটের ডিসি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রবাসীদের বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণ এবং জেলার অবকাঠামোগত অগ্রগতিতে তাদের ভূমিকা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়ে আলাদা গুরুত্ব দেন বলে প্রশাসনিক সূত্র ও প্রবাসী মহলে আলোচনা ছিল। প্রবাসীদের জন্য পৃথক ফোকাসড উদ্যোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সেতু গড়ে তোলার বিষয়টি তাঁর পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়।
অনেক প্রবাসীর মত, প্রবাসী-সম্পৃক্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সিলেটের অর্থনীতি আরও গতিময় হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জেলার প্রবাসী-নির্ভর রেমিট্যান্সকে কাঠামোগত বিনিয়োগে রূপ দেওয়া সহজ হবে।

বদলির সিদ্ধান্ত ও অনিশ্চয়তার আবহ
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মোঃ সারওয়ার আলমকে সিলেটের ডিসি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে সিদ্ধান্তের কারণ উল্লেখ না থাকলেও তা জনস্বার্থে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটের বিভিন্ন মহলে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে শাহজালাল (র.) ও শাহপরান (র.) মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগকে ঘিরে প্রশাসনিক ও সামাজিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই বদলি এসেছে। মাজারের তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ডোনেশন বক্স পরিবর্তন, ঐতিহ্যবাহী বিশাল ডেগ বন্ধ করে নতুন বাক্স বসানো এবং মাজারকে ঘিরে মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
এ অবস্থায় অনেকেই মনে করছেন, এমন এক সময়ে ডিসির বদলি হলো, যখন প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করে জেলা উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা দরকার ছিল।

ভালো উদ্যোগের ধারাবাহিকতা—ব্যক্তি নয়, নীতি টিকে থাকুক
প্রবাসী ও সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশের বক্তব্য—কোনো ব্যক্তি বদলে গেলেও জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব। তাদের মতে, প্রবাসীদের বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরির প্রক্রিয়া কোনো একক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা টেকসই হয় না; বরং নীতিগতভাবে তা প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর অংশ হওয়া জরুরি।
অনেকে বলছেন, প্রবাসী-কেন্দ্রিক নীতিমালা, এক্সক্লুসিভ ‘প্রবাসী ডেস্ক’ বা সেল, জেলা পর্যায়ে প্রবাসী বিনিয়োগ ফোরাম এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তোলা গেলে ব্যক্তি বদলালেও উদ্যোগ থেমে যাবে না।

নতুন প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের পর সিলেটের নতুন ডিসি নিয়োগের অপেক্ষা চলছে, আর এই সময়েই প্রবাসী মহলে প্রশ্ন—নতুন ডিসি কি পূর্বসূরির প্রবাসী-কেন্দ্রিক স্বপ্নকে এগিয়ে নেবেন, নাকি নতুন অগ্রাধিকার ঠিক করবেন? প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রবাসী ও স্থানীয় অংশীজনদের আস্থা অর্জন করে নীতি-ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নতুন ডিসির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সুযোগও।
সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, প্রবাসীসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রবাসী-বিনিয়োগকে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও লাভজনক করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

প্রবাসীদের প্রত্যাশা: উদ্যোগ থেমে নয়, আরও শক্তিশালী হোক
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাষ্য, তারা ব্যক্তি বদলির চাইতে প্রাধান্য দেন ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে। তাদের প্রত্যাশা, যেসব উদ্যোগ প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করে জেলা উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে, সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে সামনে এগিয়ে নেওয়া হবে।
অনেকেই মনে করছেন, সিলেটের উন্নয়ন ও প্রবাসীদের সঙ্গে প্রশাসনের কার্যকর সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে ভবিষ্যতেও ইতিবাচক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে এই প্রবাসী-কেন্দ্রিক স্বপ্ন মাঝপথে থেমে যাবে না; বরং নতুন রূপে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।