শ্রীপুরে পাওনাদারের ষড়যন্ত্র ও পুলিশের গাফিলতিতে যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ: বাবার কবরের পাশে অবুঝ শিশু
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ৩ বছরের অবুঝ শিশুকন্যা নুসরাত বলছে বাবা ঘুমিয়ে আছে। আমাকে মজা কিনে দিবে না। ওই শিশু জানেনা তার বাবা আর ফিরে আসবে না। কিছুক্ষন পর পর বাবার কবরের পাশে ছুটে যাচ্ছে শিশুটি। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে স্বামী হারানোর শোকে বিলাপ করছে স্ত্রী বাবলী আক্তার। তার পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা।
গাজীপুরের শ্রীপুরে পাওনাদারের ষড়যন্ত্র এবং পুলিশের চরম অমানবিকতা ও গাফিলতির কারণে মাহবুব আলম সুজন (৩২) নামে এক যুবকের করুণ মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে শরবতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দেওয়ার পর মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ২ ঘণ্টা রাস্তায় ঘুরিয়েছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

নিহত মাহবুব আলম সুজন উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়নের বাউনী গ্রামের দিনমজুর নূরুল ইসলামের ছেলে।

নিহত মাহবুবের বাবা নূরুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সালে প্রতিবেশী সুরাইয়া বেগমের কাছ থেকে ১ পাতার স্ট্যাম্পে সই দিয়ে ৩০ হাজার টাকা (ঋণ) নেন তিনি। কিছুদিন পর ৫ হাজার টাকা লাভও পরিশোধ করেন। সে সময় মাহবুব প্রবাসে ছিলেন। সুরাইয়া বেগম সুকৌশলে মাহবুবের প্রবাসের নম্বর সংগ্রহ করেন এবং নিজের ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর পরামর্শের কথা বলে এক দালালের যোগাযোগ করিয়ে নেন।
পরবর্তীতে পাওনা টাকা ও দালালের দেনদরবার নিয়ে গ্রামে সালিসি বৈঠক বসে। সেখানে ৩০ হাজার টাকার ১ পাতার স্ট্যাম্পকে জালিয়াতি করে ৩ পাতার ৪ লাখ ২০ হাজার টাকার প্রতারণার কাগজ বানিয়ে মাতব্বরদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। অসংগতি তুলে ধরলেও মাতব্বরদের চাপে পড়ে ৫৫ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন নূরুল ইসলাম।

মাহবুব আলমের স্ত্রী বাবলী আক্তার বলেন, গত ৫ আগস্ট রাত ১০ টার দিকে স্বামীকে ফোন করে ডেকে নেন প্রতিবেশী সুরাইয়া বেগম। সঙ্গে তিনিও যান। একপর্যায়ে পানি চাইলে দুই গ্লাস শরবত এনে দেন সুরাইয়া। শরবত খাওয়ার পরপরই বুকে জ্বালাপোড়া যন্ত্রণা শুরু হয়। বাড়িতে প্রবেশ করতেই পুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে ফেলে। সমান তালে বমি করছেন। অনেক অনুরোধ করলাম তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান। তবুও পুলিশের মারা হয়নি। মন গলেনি। শেষ পর্যন্ত স্বামীকে বাঁচানো গেলো না। মেয়েটা বাবার খুবই পাগল একটু সময় না দেখলে ডাকাডাকি শুরু করে। দৌড়ে কবরের পাশে ছুটে যায়। কি বলে শান্তনা দিবো মেয়েকে? ন্যায় বিচারের জন্য গত মঙ্গলবার শ্রীপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

মাহবুব আলমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, “হঠাৎ করে পুলিশ এসে আমাদেরকে আটক করে৷ আমার অসুস্থ ছেলেটাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে উঠায়। কত করে অনুরোধ করলাম ছেলেটা মারা যাচ্ছে আগে হাসপাতালে নেই। পুলিশ শুনলো না। তাকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে এগুলো বলতেই পুলিশ হাসাহাসি ঠাট্টা মশকরা করে। শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলো। কই এখন তো পুলিশ আসে না। বাবা মাটির নিচে ঘুমাচ্ছে। এখন এসে ধরে নিয়ে যাক। আচ্ছা পুলিশ কি মানুষ না?
অভিযুক্ত সুরাইয়া বেগম শিবলী বলেন, মাহবুব আলম বিদেশে থাকা অবস্থায় বিকাশের মাধ্যমে টাকা নিছে। টাকা না দেওয়ার কারণে মামলা করছেন। শরবতের সঙ্গে বিষ মেশানোর বিষয়টি সম্পুর্ণ মিথ্যা।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ সাবরিনা বলেন, ৫ আগস্ট দিবাগত রাতে ২ টার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। কীটনাশকের কারণে রোগীর অবস্থা আশংকাজনক ছিলো। তবুও স্বজনদের মুসলেকার পর ওয়াশ করে গাজীপুরে রেফার্ড করা হয়েছে।
শ্রীপুর থানার সহকারী (উপ-পরিদর্শক) এএসআই এমদাদ হোসেন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে প্রতারণা মামলার ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামি মাহবুবসহ তার বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বয়স বিবেচনায় বৃদ্ধ মহিলা ছেড়ে দেওয়া হয়। রাস্তা ঘুরাঘুরি করে সময় নষ্ট করা হয়নি। সিএনজি চালক পথ ভুল করায় একটু সময় বেশি লাগছে। থানায় আসার অনেক সময় পর সে অসুস্থ হয়ে পসচাড়লে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল কতৃপক্ষ জানায় সে কীটনাশক পান করছে তার অবস্থা ভালো না। পরবর্তীতে সেখানে তাদের এক আত্নীয়ের জিম্মায় দিয়ে চিকিৎসা করতে বলা হয়।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, গ্রেপ্তারের পর থানায় নিয়ে আসলে সে সুস্থ ছিলো। অসুস্থ হলে মানবিক কারণে একজনের জিম্মায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাকে কীটনাশক খাওয়ানো হয়েছে কিনা এটি আসামি মাহবুব পুলিশকে বলেনি। থানায় অসুস্থ হওয়ার পরপরই হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত ছাড়া কীটনাশক পান করে মারা যাওয়া একজন আসামির দাফন হলো কি করে? এমন প্রশ্নের জবাবে কোন সঠিক উত্তর দেননি তিনি। তিনি আরও জানান, এবিষয়ে মাহবুব আলমের স্ত্রী বাদী হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।