শ্রীপুরে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা উৎসব: বিসর্জনের আগে অর্ধশতাধিক প্রতিমার মিলনমেলা
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি;
গাজীপুরের শ্রীপুরে তিন শতাব্দীর দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে উদযাপিত হলো বিজয়া দশমীর ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা উৎসব। উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ঐতিহাসিক কাচারি মাঠে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে এক আনন্দঘন পরিবেশে উপজেলার বিভিন্ন মন্দিরের অর্ধশতাধিক প্রতিমার মিলনমেলা ঘটে। প্রতিমা প্রদর্শনী, শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ এবং পারুলী নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দীর্ঘদিনের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন।

স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই উৎসব কেবল কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চার এক অনন্য প্রতীক। প্রতিবছর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে বিভিন্ন মণ্ডপ ও মন্দির থেকে ঢোল-ঢাক আর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে প্রতিমা নিয়ে পূজারি ও ভক্তরা জড়ো হন ঐতিহ্যবাহী এই মাঠে। সমবেত সব প্রতিমার মধ্য থেকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করা হয়।অনুষ্ঠান শেষে পর্যায়ক্রমে প্রতিমাগুলো পাশের পারুলী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।

উৎসব উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু।
শ্রীপুর উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি বাবু অরুণ চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য বলেন, “প্রায় ৩০০ বছর ধরে একই মাঠে বিজয়া দশমীর প্রতিমা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, যা তাঁরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করে চলেছেন।”
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশপ্রেম ও ঐক্যের বন্ধন যেন কোনো অবস্থাতেই নষ্ট না হয়। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাচ্চু উল্লেখ করেন যে, বিএনপি বিশ্বাস করে সব ধর্মের মানুষ যেন নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে পালন করতে পারেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন এবং তাঁর দক্ষ দিকনির্দেশনায় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব দেশের কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের সভাপতি বাবু অরুণ চন্দ্র দাস বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মাঠে বিজয়া দশমীর উৎসব পালন করে গেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এখানে প্রতিমা একত্রিত করে মেলা ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের আয়োজন করা হচ্ছে। নদীর জলে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে।”

উৎসবে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব খাইরুল কবির মণ্ডল আজাদ, শ্রীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহফুল হাসান হান্নান, রাজাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক নাজমুল হুদা শাহীন, এবং উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক অর্জুন কুমার মণ্ডলসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের নেতৃবৃন্দ, পূজারি ও ভক্তবৃন্দ।
তিনটি শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী রাজাবাড়ির কাচারি মাঠের এই আয়োজন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সংহতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।