শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: জাতীয় ফল কাঁঠালের রাজধানী খ্যাত গাজীপুর, আর তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদিত হয় শ্রীপুর উপজেলায়। তবে প্রতিবছর ভরা মৌসুমে বাজারে ধস নামে কাঁঠালের দামে। সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে গাছের নিচেই পচে নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল। এতে একদিকে যেমন কৃষকেরা বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন, অন্যদিকে নষ্ট হয় দেশের অন্যতম পুষ্টিকর একটি ফল।
তবে এই চেনা সংকটকেই এবার সম্ভাবনায় রূপ দিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুরের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভূঁইয়া। পাকা কাঁঠালের রস দিয়ে তৈরি করছেন সুস্বাদু বিস্কুট, যা ইতিমধ্যে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন উদ্ভাবন শ্রীপুরের বৈরাগিরচালা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস ছাত্তার মূলত একজন শৌখিন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে তিনি দেখেছেন, কীভাবে স্থানীয় ফল-ফসল থেকে বৈচিত্র্যময় খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হয়। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই নিজের এলাকায় দেশের অন্যতম প্রধান ফল কাঁঠাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। অবশেষে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলসে’ গত দুই মাস ধরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে কাঁঠালের রস দিয়ে বিস্কুট তৈরির কাজ।
বাজারে দারুণ চাহিদা, আসছে নতুন পণ্য
আপাতত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও বাজারে এই বিস্কুটের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভূঁইয়া বলেন,”আমাদের এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদন হলেও তা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। বিদেশে দেখে আসা প্রযুক্তি ও পরামর্শ কাজে লাগিয়ে আমি নিজেই কাঁঠালের বিস্কুট উৎপাদন শুরু করি। এখন দেখছি এর দারুণ চাহিদা। নিজের শোরুম ও অনলাইনের পাশাপাশি অর্ডার নিয়ে বিভিন্ন জেলাতেও পাঠানো হচ্ছে এই বিস্কুট। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে।” এই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আগামী বছর বিস্কুটের পাশাপাশি কাঁঠাল দিয়ে ড্রাই কেক, রশি (ক্যান্ডি জাতীয়) ও চিপস তৈরির পরিকল্পনাও করছেন তিনি।

নতুন এই পণ্যের বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদনের বিষয়ে উদ্যোক্তা জানান, তাঁদের অন্যান্য বিস্কুট তৈরির অনুমোদন রয়েছে। কাঁঠালের বিস্কুটটি যেহেতু পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি হচ্ছে, তাই এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যে বিএসটিআই-এর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে।
কারখানার কর্মী মানিক মিয়া জানান, বিস্কুট তৈরির জন্য প্রথমে ভালো জাতের কাঁঠাল বাছাই করা হয়। পাকা কাঁঠাল থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রস বের করার পর তার সঙ্গে ঘি, মাখন, দুধ ও ময়দা মিশিয়ে কাঁচা বিস্কুট তৈরি করা হয়। এরপর বড় ওভেনে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট বেক করার পর ঠান্ডা করে প্যাকেটজাত করা হয়।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বলেন, কাঁঠালের মৌসুমে দাম কমে যাওয়ায় চাষীরা ঠিকমত দাম পান না। এই অর্থবছরে শ্রীপুরে প্রায় ২৯ শত ৫০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। উৎপাদিত হয়েছে ৬০ হাজার মেট্রিক টন। মৌসুমে যদি কাঁঠালের অপচয় রোধ ও প্রক্রিয়াজাত করা যায় তাহলে বাজার মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষকরা কাঁঠাল চাষে আরও উৎসাহিত হবেন।
তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির সুযোগও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের যেকোনো শিল্পোদ্যোগে কৃষি বিভাগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
শ্রীপুরের এই কাঁঠালের বিস্কুট দেশের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে এবং কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।